সরোজ দত্তের শহীদ দিবস ৫ই অগাস্ট

কবি সাংবাদিক সরোজ দত্তের সব চেয়ে বড় পরিচয় হল তিনি হলেন এক আজন্ম বিপ্লবী কমিউনিস্ট যার কর্মকান্ড নিশানা করেছিল পুরানো সমাজ কে ভাঙ্গার কাজে এবং পুরানো সমাজের সামন্ততান্ত্রিক – ঔপনিবেশিক ধ্যান ধারনা – চেতনা এবং সেই সমাজের কর্তাদের দ্বারা তাদের শ্রেনীর শোষনের স্বার্থে যে সমস্ত প্রথা সৃষ্টি করেছিল, এবং শাসক শ্রেনীর যে সব রক্ষিতাদের মহান বলে স্থাপন করা হল তাদের সেই সব স্থাপনা কে ধ্বংস করার কারিগরদের প্রধান ছিলেন সরোজ দত্ত। তিনি বিপ্লবী এবং তাঁর বিপ্লবী সংগ্রাম ও বিপ্লবী রাজনীতির থেকে তাকে বিচ্ছিন্ন করে দেখানোর প্রচেষ্টা আসলে সামন্তবাদ – সাম্রাজ্যবাদের পা চাটা কুকুর বুদ্ধিজীবিদের একটি শয়তানি ষড়যন্ত্র। যেমন লেনিন বলেছিলেন যে কোনো মহান বিপ্লবীর মৃত্যুর পর বুর্জোয়াদের পেটোয়া বুদ্ধিজীবিরা তাদের নিরীহ বুদ্ধিজীবি হিসেবে চালাবার চেষ্টা করে তাদের রাজনীতির থেকে তাদের বিচ্ছিন্ন করে। অথচ এই সমস্ত বুদ্ধিজীবিরাই বিপ্লবীদের জীবনকালে তাঁদের বাপান্ত না করে পানি গ্রহণ করে না।

সরোজ দত্ত ছিলেন এদের বিরুদ্ধে। তাঁর কলমের ধারে মুন্ডুপাত হত এহেন বুদ্ধিজীবি শ্রেনীর ও তাদের মালিকদের। মাও সে তুঙের চিন্তাধারার আলোয় যখন চারু মজুমদার ভারতবর্ষে গড়ে তুললেন নকশালবাড়ী তখন সরোজ দত্ত সমস্ত সংশোধনবাদের বিরুদ্ধে লড়াই জারি রেখে দেখালেন চারু মজুমদারের পথের সার্থকতা এবং সিপিআই (এম-এল) পার্টি প্রতিষ্ঠা করায় এক মহান ভূমিকা পালন করেন। পার্টির ভিতরে ও দেশব্রতী পত্রিকার মাধ্যমে চারু মজুমদারের বিপ্লবী কতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে সবচেয়ে অগ্রগামী ভূমিকা পালন করেন সরোজ দত্ত। তাই তো তিনি ঘৃণিত হলেন সাম্রাজ্যবাদের পাত চাটা শোধনবাদী কুকুরদের কাছে এবং তাদের পেটোয়া সাংবাদিককুলের কাছে।

চারু মজুমদার বললেন “সরোজ দত্তের ক্ষুরধার লেখনীকে ভয় করত না এমন কোন প্রতিক্রিয়াশীল নাই” আর তাই তো খুনি ইন্দিরার খুনি পুলিশ শুধু হত্যা করেই ক্ষান্ত হল না ৭০ বছরের বিপ্লবীকে তাঁর মাথা কেটে নিয়ে গেল ব্রেজনেভ – নিক্সন – ইন্দিরা – চবনের ভাড়াটে নেড়ি কুকুরের দল। ওদের খাতায় সরোজ দত্তকে নিখোঁজ দেখাতে। কিন্তু সরোজ দত্ত তো নিখোঁজ হলেন না। তিনি শহীদ হয়ে আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে গেঁথে বসলেন বিপ্লবী শ্রমিক – কৃষকের হৃদয়ে। তাঁরই পদচিন্হ বেয়ে এগিয়ে চলে যখন মহাদেব মুখার্জীর নেতৃত্বে সিপিআই (এম-এল) কেন্দ্রীয় কমিটি যখন চারু মজুমদারকে ১৯৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে ভারতের বিপ্লবের কতৃত্ব হিসেবে ঘোষণা করল যা পরবর্তিতে ১৯৭৩ এর ডিসেম্বর এ অনুষ্ঠিত পার্টির দ্বিতীয় (নবম) কংগ্রেস এর মঞ্চ থেকে ঘোষিত হল কামান গর্জনের মতন এবং কামালপুরের মাটিতে শ্রেণী শত্রু খতম এক নয়া স্তরে উন্নীত হল তখন শাসকশ্রেণী ও তার কুকুরদের পাল লেজ গুটিয়ে পালাতে থাকলো, চারু মজুমদারের কতৃত্ব শহীদের রক্তের ভিতে প্রতিষ্ঠিত এই সত্য প্রতিষ্ঠা হল এবং একে খন্ডন করার কোনো ক্ষমতাই আর শাসক শ্রেণী ও তার পেটোয়া রক্ষিতাদের রইলো না।

লিন পিয়াও যেমন করে চীনা কমিউনিস্ট পার্টির ভিতরে ও বাইরে মাও সেতুঙের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চালান তেমনিই ভারতে সরোজ দত্ত পার্টির ভিতরে ও বাইরে সামগ্রিক জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবে চারু মজুমদারের কতৃত্ব প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে নেতৃত্ব দেন। তাঁর লেখনীর ভয়ে ও বিপ্লবীদের কোত্কার ভয়েই তো সেদিন বেইমান কানু – সৌরেনের দল চারু মজুমদারের কতৃত্ব কে কথায় কথায় স্বীকার করার ভনিতা করে। তাই শুধু লিন পিয়াও কে হত্যা করেই, চারু মজুমদারকে শেষ করা যাবে না বুঝেই তো সাম্রাজ্যবাদ ও সামাজিক সাম্রাজ্যবাদের নেড়ি কুকুরের পাল আগে সরোজ দত্ত কে হত্যা করে তার পর লিন পিয়াও কে হত্যা করে এবং লিন পিয়াও এর হত্যার খবরটাও চারু মজুমদার শহীদ হওয়ার পর প্রচার করে।তাই মহাদেব মুখার্জী পরবর্তীতে দেখালেন যে লিন পিয়াও ও সরোজ দত্ত একই সংগ্রামের সহযাত্রী ছিলেন। তাই তো তাঁদের হত্যা করাটা শাসক শ্রেনীর এত জরুরি ছিল।

সরোজ দত্ত এই হত্যার খবর জানতেন। তাঁর কাছে বিষয়টা শ্রেণী সংগ্রামের সাথে ওতপ্রত ভাবে জড়ানো ছিল। চারু মজুমদার কৃষককে মুক্তির পথ দেখালেন এবং সেই পথ চলে কৃষক যুগ যুগ ধরে চলতে থাকা সামন্তবাদী শোষণ অত্যাচারের বিরুদ্ধে গর্জে উঠে জোতদার জমিদারের ঘাড় মটকে যখন রক্ত খাওয়া শুরু করল তখন শাসক শ্রেনীর মহলে ত্রাহি ত্রাহি রব।  সরোজ দত্ত কৃষক – শ্রমিকের পক্ষে তাই তাঁকে খুন করার অভিলাষ তো সেই শাসক শ্রেনীর জন্মাবেই। জানতেন সরোজ দত্ত, তবু ভয় পাননি, কারণ তিনি যে পার্টির নেতা। এমন তেমন পার্টি নয়, শহীদের রক্তে লাল যে পার্টির পতাকা, শ্রমিক শ্রেনীর নেতৃত্বে সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবের সংগ্রামে নেতৃত্ব দিচ্ছে যে পার্টি সেই সিপিআই (এম-এল ) এরই তো নেতা সরোজ দত্ত।  তাই চারু মজুমদারের ভাষায় “কমরেড সরোজ দত্ত পার্টির নেতা ছিলেন এবং নেতার মতই তিনি বীরের মৃত্যু বরণ করেছেন।”

সেই বীরের মতন মৃত্যুকে নিয়ে আজ নকশাল ছাল গায়ে দেওয়া ছাগলের দলের নেতারা, সেই দীপঙ্কর ভট্টচার্জ প্রভৃতি গোষ্ঠি যখন ভোটের রাজনীতি করার তাগিদে যখন শহীদ হত্যার “বিচার” চায় খুনি রাষ্ট্র ও তার কর্তা সেই সামন্তবাদ ও মুত্সুদ্দি বুর্জোয়াদের কাছে, যখন শহীদের রক্তদান কে ব্যবহার করে ভোট ভিক্ষা করে, যখন সরোজ দত্ত কে বিচার করে “একপেশী” বলে নিজেদের মুখপত্রে, তখন চারু মজুমদারের সেই আহ্বান কে স্মরন করেন বিপ্লবীরা যাতে তিনি সরোজ দত্তের হত্যার বদলা নেওয়ার কথা বললেন :”শ্রমিক এবং দরিদ্র ভূমিহীন কৃষকের সাথে একাত্ম হয়ে এই হত্যাকান্ডের বদলা নিতে হবে।” বদলা নেবেন শ্রমিক কৃষক শুধু শাসক শ্রেনী ও তাদের স্বঘোষিত দালালদের থেকেই নয়, বরং এই নব্য সরোজ দত্ত প্রেমী সাজা সংশোধনবাদী জোচ্চোর বজ্জাতদের থেকেও। কারণ এরাও সরোজ দত্তের খুনি। তাই সুভাস বোস এর উপর তাঁর প্রবন্ধে সংশোধনবাদীদের নিয়ে সরোজ দত্ত যেই উক্তি ব্যবহার করেছিলেন তাই আবার শ্রমিক – কৃষকের পল্টন বলবে – “লাথি মেরে শুয়োরের বাচ্চাদের দাঁতের পাটি খসিয়ে দেই।”

অমর শহীদ সরোজ দত্ত তোমায় জানাই লাখ লাখ লাল সেলাম।

 

চারু মজুমদারের শহীদ দিবসের শপথ

চারু মজুমদারের শহীদ দিবস এবারের ২৮শে জুলাইয়ের শপথ নিল তাঁরই নিজের হাতে গড়া পার্টি সিপিআই (এম-এল), যা আজ তাঁর উত্তরাধিকারী মহাদেব মুখার্জীর দ্বারা প্রতিষ্ঠিত দরিদ্র – ভূমিহীন কৃষক শ্রেণী নেতৃত্বে পরিচালিত। চারু মজুমদার স্মরণে তার মূর্তিতে মাল্যদান করার প্রাক্কালে পার্টির নেতা মানিক সকল পার্টি ও শ্রেণীকে চারু মজুমদারের পথে চলার নির্দেশ দেন ও আহ্বান করেন মুক্তি যুদ্ধ কে ত্বরান্বিত করতে।

মার্কসবাদ – লেনিনবাদ মাও সেতুঙের চিন্তাধারাকে সঠিক ভাবে ভারতের বিশেষ পরিস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োগ করেন চারু মজুমদার ও ১৯৬৭ সালে সৃষ্টি করেন নকশালবাড়ীর সংগ্রামের। বসন্তের এই বজ্র নির্ঘোষ জাগিয়ে তলে সমগ্র দেশের দরিদ্র ভূমিহীন কৃষক ও শ্রমিকের মুক্তির আকন্খা এবং ছড়িয়ে দেয় সশস্ত্র কৃষি বিপ্লবকে।

১৯৬৯ এ প্রতিষ্ঠা করেন ভারতের একমাত্র বিপ্লবী পার্টি সিপিআই (এম-এল ) এর এবং ছড়িয়ে দেন কৃষি বিপ্লবকে প্রতিটি কোনায়। ডান – বাম দুই বিচ্যুতির বিরুদ্ধে লড়ে তিনি সিপিআই (এম-এল) দলের সঠিক লাইন কে প্রতিষ্ঠা করেন। আতঙ্কিত প্রতিক্রিয়াশীল শাসক শ্রেণী হত্যা করে চারু মজুমদারকে ১৯৭২ এর ২৮শে জুলাই। কিন্তু শহীদ হওয়ার চার দশক পরেও চারু মজুমদারের রাজনীতি ও আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াচ্ছে প্রতিক্রিয়াশীল শাসক শ্রেণী কে তাই তো তারা নামিয়ে আনছে জনগণের উপর বর্বর হামলা, মুছতে চাইছে বিপ্লবের নিশান।  কিন্তু মুর্খের দল এই সত্য উপলবদ্ধি করেনি যে আদপে বিপ্লবী কে হত্যা করে বিপ্লবকে হত্যা করা যায় না।

সমস্ত সিপিআই (এম-এল) ক্যাডার ও নেতৃত্ব এই দিনটিকে বিশেষ ভাবে দেশের প্রতিটি কোনায় পালন করছেন। এবং লাল ঝান্ডার তরফ থেকে সিপিআই (এম-এল) দলের সদস্য – কর্মী সমর্থকদের কে আমরা শহীদ দিবসের লাল সেলাম জানাই এবং ভারতবর্ষের বিপ্লবের কান্ডারী ও পথ প্রদর্শক চারু মজুমদার কে জানাই লাল সেলাম।

লাল ঝান্ডার প্রয়াস হল চারু মজুমদারের রাজনীতির আলোকে বর্তমান রাজনীতিকে উপলব্ধি করা এবং পাঠক কে অবগত করা। আমাদেরও শপথ এই মহান শহীদ দিবসে চারু মজুমদারের দেখানো পথে এগিয়ে চলে মুক্ত পৃথিবী গড়ে তোলার সংগ্রামে আমরাও হব শামিল।
চারু মজুমদার কে লক্ষ লক্ষ লাল সেলাম।

সাহরানপুর দাঙ্গা – ফ্যাসিবাদের কামড়

আমরা গত ৬ জুলাই লিখেছিলাম উত্তরপ্রদেশের মুরাদাবাদ অঞ্চলে দাঙ্গা লাগাবার পরিকল্পনা করছে বিজেপির ষড়যন্ত্রী মন্ত্রী – সান্ত্রী’রা। সেই ষড়যন্ত্রের ফলেই অনুষ্ঠিত হল পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের সাহারানপুরের বুকে দাঙ্গার। ২৬শে জুলাই সকাল বেলা রেল স্টেশন সংলগ্ন গুরু দ্বারার সন্নিকটে একটি জমির মালিকানা নিয়ে উস্কে দেওয়া হল সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা এবং তার ফলে হল ৩ জনের মৃত্যু ও প্রায় ২৫ জন আহত। এবং এই ঘটনার মধ্যে দিয়ে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের রেখাটি আরও স্পষ্ট করে টেনে দিতে সক্ষম হল ফ্যাসিবাদী বিজেপি ও তার সাঙ্গপাঙ্গরা।

ভারতের মসনদে আসীন হওয়ার পর থেকেই ফ্যাসিবাদী মোদী সরকার ও তার পৃষ্টপোষক মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ – দেশি মুত্সুদ্দি বুর্জোয়া শ্রেণী – এবং জোতদার জমিদারদের তীব্র আকঙ্খা হল তাদের লুট ও লালসাকে চরিতার্থ করার স্বার্থে জনগণের ঐক্য কে চূর্ণ করে দেওয়ার। যাতে সমস্ত শয়তানি ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ গণ সংগ্রাম না গড়ে উঠতে পারে এবং মেহনতি মানুষের বিপ্লবী সংগ্রাম কে ধাক্কা দেওয়া যায়।

গত বছরের মীরুট দাঙ্গায় প্রায় ৬২ জন সংখ্যালঘু মুসলমান প্রাণ হারান ও প্রায় পঞ্চাশ হাজারের উপর মুসলমান মানুষ, বিশেষত গরীব ও ভূমিহীন কৃষক ও গ্রামীন কারিগরেরা বাস্তুহীন হন নিজের দেশেই। সেই মীরুটের পাশের সাহারানপুরে সাম্প্রদায়িক বিভাজনের কাজটি এগিয়ে রেখেছিল বিজেপি ও গৈরিক সন্ত্রাসবাদীরা, সাথে ছিল অখিলেশ সরকারের সমর্থনে ফুলে ফেঁপে ওঠা মৌলবাদী প্রতিক্রিয়াশীলরা, এদের যৌথ ষড়যন্ত্রে বেশ কিছু দিন থেকেই খুবই উপদ্রুত হয়ে ছিল পশ্চিম উত্তরপ্রদেশের এই এলাকা। এরই মধ্যে হরিয়ানার প্রতিক্রিয়াশীল কংগ্রেসি মুখ্যমন্ত্রী হুডা শিখ ধর্মালম্বীদের মধ্যে বিভেদ ও ঝামেলা পাকাবার উদ্দেশ্যে শিরোমণি গুরুদ্বারা প্রবন্ধক এর হরিয়ানা বিভাগ তৈরি করে যার ফলে সাহারানপুরে শিখ ধর্মালম্বীদের মধ্যে উত্তেজনার সৃষ্টি হয়। এরই সাথে সাথে যুক্ত হল শনিবারের দাঙ্গা। যদিও শহরে কার্ফু জারি করেছে প্রতিক্রিয়াশীল অখিলেশ সরকার তবুও খোলাখুলি বিজেপি ও সংঘ পরিবারের সদস্যরা সংখ্যালঘু মুসলমানদের বিরুদ্ধে সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দুদের খেপিয়ে তুলছে, যদিও প্রাথমিক ভাবে দ্বন্ধ হল একটি জমির মালিকানা নিয়ে।

লোক দেখানো বিরোধ দেখিয়ে সরকারী প্রতিক্রিয়াশীল পার্টিগুলি যেমন কংগ্রেস, সমাজবাদী পার্টি, বহুজন সমাজ পার্টি, সংশোধনবাদী বামপন্থীরা এবং অন্য দলেরা এখন সংখ্যালঘু দরদি সাজতে চাইছে, অন্যদিকে বিজেপির সেই বালাই নাই। খোলাখুলি দেশের জনগণকে ঔদ্ধত্ব দেখাচ্ছে বিজেপি। কিন্তু এই ফ্যাসিবাদী সন্ত্রাসে নিহত ও আহত মানুষদের দিকে ঘুরেও দেখছে না কেউ।  একমাত্র চারু মজুমদারের হাতে গড়া ও কৃষক নেতা মানিকের নেতৃত্বে পরিচালিত সিপিআই (এম-এল) কড়া ভাষায় এই ঘটনার নিন্দা করেছে এবং আহ্বান করেছে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি কে চোখের মনির মতন রক্ষা করতে এবং বিপ্লবী কৃষক যুদ্ধের মাধ্যমে ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলি কে পরাস্ত করতে।

আজ যখন ভারতের আকাশে কালো দুর্যোগের ছায়া ঘনিয়ে আসছে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ঠিক সেই সময় খুব জরুরি কর্তব্য হল শ্রমিক কৃষক ও মেহনতি মানুষের ঐক্য গড়ে তোলা কারণ ঐক্যবদ্ধ সংগ্রামই পারে ফ্যাসিবাদ কে পরাস্ত করতে।

তাই সাহারানপুরের মাধ্যমে আরও দাঙ্গা লাগাবার চক্রান্ত কে ব্যর্থ করুন।

জনবিরোধী বিমা বিল এর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ সংগ্রাম গড়ে তুলুন

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও তার দেশী দালাল মুত্সুদ্দি বুর্জোয়াদের টাকায় নির্বাচন জিতে এসেই ফ্যাসিবাদী বিজেপি ও তার মধ্যমণি গুজরাটের মুসলমান নিধনযজ্ঞ’র হোতা নরেন্দ্র মোদী কংগ্রেসের ফেলে যাওয়া কাজগুলি, যা মার্কিন সাম্রাজ্যবাদ ও দেশীয় মুত্সুদ্দি পুঁজিপতিদের স্বার্থপূরণ করে সেই সমস্ত কর্মকান্ডকে অগ্রগতি দিতে উঠে পড়ে লেগেছে।

বিমা বেসরকারীকরণের যে দৌড় এক কালে অটল বিহারী বাজপেয়ী নেতৃত্বাধীন বিজেপি সরকার চালু করে তার মাধ্যমে সাম্রাজ্যবাদী পুঁজি বেশি বেশি করে দিশি মুত্সুদ্দি বনিয়াদের খোলা বিমা সংস্থাগুলি তে নিবেশিত হয়। প্রথমত এই বিমায় বিদেশী বিনিয়োগের উচ্চ সীমা রাখা হয় ২৬ % যা নিয়ে বিদেশী বিনিয়োগকারী ও তাদের দিশি দালালরা বিকট চিত্কার চেঁচামিচী শুরু করে কারণ আইনি পথে তারা বেশি মুনাফা করতে পারছিল না।

বিদেশী সাম্রাজ্যবাদী বিনিয়োগকারীদের অন্যতম কিছু গোষ্ঠী হল ব্রিটেনের বিইউপিএ বা বুপা যারা অনালজীত সিংহের ম্যাক্স গোষ্ঠির সাথে ঐক্যবদ্ধ হয়ে ম্যাক্স বুপা প্রতিষ্ঠা করেছে, মুত্সুদ্দি বুর্জোয়াদের অন্যতম টাটা গোষ্ঠী হাত মিলিয়েছিল মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের বহু পুরানো খুঁটি আমেরিকান ইন্সুরেন্স গ্রুপ বা এআইজির সাথে টাটা এআইজি প্রতিষ্ঠা করতে, তেমনি আরও এক বনেদি মুত্সুদ্দি বিড়লা হাত মেলায় ক্যানাডার সান গ্রুপের সাথে বিড়লা সান লাইফ প্রতিষ্ঠা করতে।

এই সমস্ত যৌথ উদ্যোগ আসলে দিশি দালালদের ব্যবহার করে সাম্রাজ্যবাদীরা তাদের লোভ ও লালসাকে চরিতার্থ করতে এবং ভারতবর্ষের জনগণ কে শুষে নিংড়ে মুনাফার পাহাড় গড়তে। এই সব ছাড়াও সরকারী বিমা সংস্থা যেমন জীবন বিমা কর্পোরেশন, জেনারেল ইন্সুরেন্স, ও ন্যাশনাল ইন্সুরেন্স কোম্পানিগুলিতে বিনিয়োগ করতে সাম্রাজ্যবাদীরা অতি তত্পর হয়ে উঠেছে, তার কারণ এই সমস্ত সরকারী কোম্পানিগুলিতে জমা আছে দেশের খেটে খাওয়া ব্যাপক জনগণের রক্তে ঘামে অর্জিত টাকা। বিমা ব্যবসায় অর্থের পুলটাই সবচেয়ে জরুরি, যা গড়ে ওঠে সংস্থার গ্রাহকদের টাকায়। এই টাকার থেকেই পরবর্তীতে গ্রাহকদের বিমা দাবির টাকা মেটানো হয়, এবং এর ফলে এক ব্যাপক মুনাফার পাহাড় গড়ে তলে বিমা কোম্পানি এবং এই পুঁজির বৃহত অংশ আবার বিনিয়োগ হয় শেয়ার বাজারে। এই অর্থের বিপুল পাহাড় সাম্রাজ্যবাদীদের জিভের থেকে লালা ঝরাচ্ছে।

একবার এই অর্থের উপর কোপ মারতে পারলেই  পক্ষে  বাজারে অর্থের  পাওয়া, যে অর্থ তারা পুনরায় বিনিয়োগ করবে মুত্সুদ্দি বুর্জোয়াদের শেয়ারে। আর কংগ্রেস সরকারের এই ফেলে যাওয়া কাজটি পূর্ণ করার দায়িত্ব ন্যাস্ত হয়েছে ফ্যাসিবাদী বিজেপির উপর।  তাইতো পুরানো বিরোধিতা ভুলে আজ কংগ্রেস কে বিমা বিল পাশ করাতে তোষণ করছে বিজেপি।

ভারতের কমিউনিস্ট পার্টি (মার্কসবাদী – লেনিনবাদী) চিরকালই বলে এসেছে যে কংগ্রেস ও বিজেপি একই সাঁপের দুইটি মুখ। বর্তমানে ভারতের মসনদে আসীন দাঙ্গাবাজ খুনি মোদীর নেতৃত্বাধীন ফ্যাসিস্ট বিজেপি সরকার সেই সত্যকেই বারবার প্রমাণ করছে এবং জনগণ ভালো ভাবে বুঝছেন যে এদের রং আলাদা, ঢং আলাদা কিন্তু জাতে এরা এক।  এদের টিকি বাঁধা আছে মার্কিন সাম্রাজ্যবাদের নেতৃত্বাধীন বিশ্ব সাম্রাজ্যবাদের খুঁটিতে।

বিমা বেসরকারিকরণ বিল ও সমগ্র মানুষ খেঁকো নীতির বিরুদ্ধে আজ মেহনতি জনগণের প্রতিরোধ সংগ্রাম, শ্রমিক শ্রেনীর সলিডারিটি সংগ্রাম গড়ে তোলা প্রয়োজন।  ইতিহাস এই দায়িত্ব দিয়েছে চারু মজুমদার – মহাদেব মুখার্জীর পার্টি, হাজারো শহীদের রক্তে রাঙ্গা পার্টি সিপিআই (এম-এল) কে, তাই আজ মনের প্রসারতা বৃদ্ধি করে সিপিআই (এম-এল) এর বিপ্লবীদের ঐক্যবদ্ধ হওয়া উচিত ভারতের সমস্ত বিপ্লবী শক্তির সাথে এক তীব্র ঐক্যবদ্ধ যৌথ সংগ্রাম গড়ে তুলে ফ্যাসিস্ট সরকারের বিষ দাঁত ভেঙে দেওয়ার জন্যে।

চারু মজুমদার – সরোজ দত্ত’র শহীদ দিবসে এই শপথ নিয়ে এগিয়ে চলুন।

মালিকের ষড়যন্ত্রে এবার বন্ধ শালিমার কারখানা। গড়ে তোলো প্রতিরোধ।

এতদিন বাংলার শ্রমিক কে বদনাম করত তামাম সাম্রাজ্যবাদী ও মুতসুদ্দী বুর্জোয়ারা, যে বাংলার শ্রমিকদের জঙ্গী শ্রমিক আন্দোলনের ফলে বাংলায় কর্ম সংস্কৃতি নাই তাই তারা পাততাড়ি গোটাচ্ছে। এই অজুহাতে কত কারখানা বন্ধ হল, শ্রমিকের রক্তে গড়ে ওঠা মিল বদলে গেল হাই রাইসারে। জ্যোতি বোস, বুদ্ধ ভটচার্জ, মমতা বারুজ্জ্যে, ইত্যাদির রাজত্বে এই খেলা চলে এসেছে। কিন্তু এই কয়দিনে একটু বেশি বাড়াবাড়ি হয়ে গেল।

১৭ই জুন থেকে ১৬ই জুলাই একমাসে শুধুমাত্র হাওড়া জেলাতেই চারটি কারখানা বন্ধ হয়েছে। এগুলি হলো মালিপাঁচঘড়ার হনুমান জুট মিল, শালিমারের এনসার ইন্ডিয়া, সালকিয়ার এ্যালম এক্সট্রুশন লিমিটেড, সর্বশেষ শালিমার পেন্টস। এর মধ্যে শেষ তিনটি বন্ধ হয়েছে ১০ দিনের মধ্যে। একটি কারখানাও শ্রমিক আন্দোলনে  বন্ধ হয় নাই।  বরং ঈদ ও দূর্গা পূজার আগে মালিকেরা নিজেরাই “সাসপেনশন অফ ওয়ার্ক” নোটিস ঝুলিয়েছে এই সব কারখানায় নিজেদের উদ্যোগে। চার হাজারের উপর শ্রমিকের পেটের ভাত মারা গেল, কিন্তু শাসক ও বিরোধী দুই দলের দক্ষিন ও তথা কথিত বামপন্থী শ্রমিক সংগঠনগুলি কোনো সক্রিয় প্রতিবাদ – প্রতিরোধ না করে মালিকের পরমপ্রিয় দালালের মতন করে নিষ্ক্রিয় প্রতিবাদ ও বাজার গরম বক্তৃতা করে নিজেদের দায় সারলো। শোধনবাদী সিটু আবার মিছিলও করেছে বটে। কিন্তু প্রশ্ন হল ঠিক উত্সবের আগে আগে এই কাজ মালিকেরা করলো কেন ? নর্থ ব্রুক মিলে যখন শ্রমিকের প্যাঁদানি খেয়ে মালিকের সিইও’র আত্মারাম খাঁচা ছাড়া হয়েছে এমন সময় মালিকদের দু:সাহস হল কি করে শালিমারের মতন শত বছর পুরানো কারখানা বন্ধ করার।

 

মালিক পক্ষের দাবি যে মার্চে আগুন লাগার পর থেকে তারা আর লোকসানের ভারে কারখানা টানতে পারছিলেন না। ফলে তাদের কারখানা বন্ধ করা ছাড়া গতি নাই কারণ তাদের টাকা নাই।

 

অদ্ভূত যুক্তি! কারখানায় শ্রমিকে আগুন লাগায়নি। আগুনটা দুর্ঘটনার কারণে লেগেছে এবং এই সমস্ত দুর্ঘটনায় লোকসান বড় করে দেখিয়ে বিমা সংস্থার থেকে মোটা ক্ষতিপূরণ আদায় করা বুর্জোয়া শ্রেনীর কড়ে আঙুলের খেলা। ফলে লোকসানটা আগুনের নয় অন্য কিছুর।  মালিকরা বলছে যে তাদের পণ্য আগের মতন বিক্রি হচ্ছে না এবং বাজার দখল তলানিতে এসে ঠেকেছে। তাহলে কত টাকা বিনিয়োগ করে উত্পাদন ব্যবস্থা উন্নত করে বাজারে ফের প্রতিযোগীদের টেক্কা দেওয়া যাবে ? মালিক পক্ষের বক্তব্য – ৬০ কোটি টাকা। তাহলে সেই টাকা ঋণ নিয়ে বা বাজার থেকে নিছে না কেন ? মালিকের বক্তব্য ইতি মধ্যেই ব্যাঙ্ক তাদের ১১০ কোটি টাকা ঋণ দিয়েছে এবং  আর পাওয়া যাবে না।  এবং এই টাকা নাকি খরচা হয়ে গেছে।  শ্রমিকদের বক্তব্য তাহলে কারখানার  কিছু জমি বেচে বা লিজ দিয়ে টাকা তোলো। মালিক চুপ। বুর্জোয়া পন্ডিতদের একটি অংশের বক্তব্য টাকা শেয়ারের অংশ বেচে বা ঋণ পত্র নিয়ে যোগার করা যায়। আজকের দিনে ৬০ কোটি টাকা ওঠানো সত্যিই শত বছর পুরানো একটি সংস্থার পক্ষে কিছু কঠিন কাজ নয়। কিন্তু তাহলে সেই প্রচেষ্টা নাই কেন ? মালিক কি আর ব্যবসা করতে চায় না ? না, তা তো হয় না। বুর্জোয়া মুনাফা না কামালে আর কি করবে ?

 

বস্তুত এই মালিক পক্ষের নিশব্দ থাকার পিছনে এক গভীর ষড়যন্ত্র আছে। হাওড়া জেলা যা কলকাতার ঠিক পাশেই সেখানে রিয়াল এস্টেট ব্যবসা তীব্র ভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। নতুন নতুন এপার্টমেন্ট বানানোর জন্যে জমি কম পড়ছে এবং প্রোমোটার চক্র ও সমস্ত দালাল পুঁজিপতিরা আজ গোপন চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছে চালু অথবা বন্ধ মিলের জমি শ্রমিকদের অন্ধকারে রেখে ফ্লাট, শপিং মল, ইত্যাদী প্রজেক্টের জন্যে তুলে দেওয়ার চক্রান্তে। শালিমারের ক্ষেত্রেও আমরা এই গন্ধই তো পাচ্ছি।  না হলে শুধু বাংলার কারখানা বন্ধ করে মালিক শ্রমিকদের অন্য রাজ্যে যাওয়ার টোপ দেয় কেন ?

বাংলার সমস্ত বন্ধ কারখানায় মালিকের গুপ্ত সহযোগিতায় সমাজবিরোধীরা ও প্রোমোটার’রা জমি দখল করে গড়ে তুলছে নানাবিধ রিয়াল এস্টেট প্রজেক্ট। কর্মচ্যুত ও বাস্তুহীন হচ্ছেন শ্রমিক শ্রেণী। আজ তার পিঠ দেওয়ালে ঠেকিয়ে দেওয়ার কাজ চলছে এবং মালিক প্রোমোটার চক্রের সাথে ওতপ্রত ভাবে জড়িয়ে আছে বাম – দক্ষিন, আমরা – ওরা, সরকার – বিরোধী সব নির্বাচনী পার্টি কারণ লুটের বকরা তো সবাই পাচ্ছে।  ওই প্রসাদের ভাগ নিয়েই ওদের নিজেদের দ্বন্ধ কিন্তু আজ পেটের ভাত মারা যাচ্ছে শ্রমিকের।

 

শ্রমিক হত্যার এই চক্রান্তের কারণ আজ মুত্সুদ্দি বুর্জোয়ারা ও তাদের মনিব সাম্রাজ্যবাদ ভারতের অবসম্ভাবী জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের ভয়ে আতঙ্কিত। এবং যেহেতু শ্রমিক বিপ্লবের নেতা তাই এই শ্রমিক শ্রেণী কে দীনতা ও চরম সংকটে রেখে তাকে বিপ্লবের থেকে দুরে রাখার এই প্রচেষ্টা। কিন্তু শ্রমিকের ধর্মই বিপ্লব করা। তার পরিবার ও জীবন জীবিকায় যত সংকট ঘনাবে এবং যত অত্যাচার মালিক শ্রেণী শ্রমিকের উপর নামিয়ে আনবে ততই সে মালিকের কুকুরদের শ্রেণী চরিত্র বুঝতে শিখবে, চলমান জনগণতান্ত্রিক বিপ্লবের প্রতি, যার মূল অক্ষ কৃষি বিপ্লব, তার প্রতি আকৃষ্ট হবে এবং বিপ্লবী রাজনীতি, মাও সেতুঙের চিন্তাধারা অনুসরণ করে, চারু মজুমদারের রাজনীতি, মহাদেব মুখার্জীর রাজনীতি  – সিপিআই (এম – এল) এর রাজনীতি কে বুঝবে এবং নিজের ঐতিহাসিক দ্বায়িত্ব পালন করতে এগিয়ে যাবে। শ্রমিকের এই এগিয়ে যাওয়াটা ইতিহাসের নিয়মেই তৈরি। আজ মালিক মুত্সুদ্দি বুর্জোয়া – প্রোমোটার – নির্বাচনী পার্টি এদের কারোর ক্ষমতা নাই একে রোখার।

আজ ঘুরে ফিরে শ্রমিক গেয়ে ওঠে সুকান্ত’র গান:

 

​‘শোনরে মালিক, শোনরে মজুতদার,

তোদের প্রাসাদে জমা হ’ল কত

মৃত মানুষের হাড় !

হিসাব কি দিবি তার ?

প্রিয়াকে আমার কেড়েছিস তোরা

ভেঙ্গেছিস ঘর বাড়ী,

সেকথা কি আমি জীবনে মরণে

কখনো ভূলতে পারি ?

 

আদিম হিংস্র মানবিকতার

যদি আমি কেউ হই

স্বজন হারানো শ্মশানে তোদের

চিতা আমি তুলবই ।‘    

 

সেই চিতায় তুলবেন এবার শ্রমিকগন ওই অত্যাচারী, পেটে লাথি মারা মালিক শ্রেণীকে, প্রমোটারদের, তাদের লেজুর সব ধরনের নির্বাচনী পার্টিগুলি কে।

[টাকার অঙ্ক ও হিসাব নিয়ে মালিকের বক্তব্য আনন্দবাজার পত্রিকা ২০ জুলাই ২০১৪ থেকে নেওয়া]